চিত্রকল্প সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বিপন্ন মানব সভ্যতার ব্যাখ্যায় জীবনানন্দ দাশের মুন্সিয়ানা: 'বনলতা সেন'
রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের অনন্য সৃষ্টি 'বনলতা সেন'। দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন সময় দাঁড়িয়ে কবি অনুভব করেছিলেন আধুনিক সভ্যতার চরম শূন্যতাকে।কবিতার প্রতিটি পংক্তি বিংশ শতকের মানুষের অস্তিত্বের সংকট, ইতিহাস চেতনা ও কালক্রমে আবদ্ধ মানবাত্মার করুণ দলিল।
"হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি;"
প্রথম স্তবকে কবি নিজেকে বর্নাণ করেছেন ক্লান্ত পথিক রূপে কালসীমা অতিক্রম করে যিনি পরিশ্রান্ত এবং খুঁজে চলেছেন এক শান্তির আশ্রয়। 'হাজার হাজার বছর' সেই মহাকালের বিশালতারই প্রতীক। আর সিংহল থেকে মালয় এই যাত্রাও কবির ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয় বরং মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার কালক্রমিক চিত্রকল্প।পথিক জানিয়েছেন বিম্বিসার ও অশোকের সাম্রাজ্যকাল পেরিয়েও যে শান্তি তিনি পাননি তা যুগিয়েছে 'নাটোরের বনলতা সেন '। নানান সম্রাটের 'ধূসর জগত' -এর মধ্য দিয়ে কবি পুনরায় সময় চক্রের উল্লেখ করেছেন। যে চক্র ধরে উত্থান পতন চলেছে নানা সাম্রাজ্য নানা যুগের। কিন্ত মানব-সত্ত্বার চলন রয়েছে অন্তহীন।
এই চলন মূলত মানবজীবণের জন্ম থেকে মৃত্যুর এক মানচিত্র। আর বনলতাকে তুলনা করেছেন মরণোত্তর পরম শান্তির সাথে।
দ্বিতীয় স্তবকে কবি বিকিরণ করেছেন বনলতা সেনের রূপের ছটা।এই বর্ণনায় বনলতা এক সাধারণ নারী থেকে এক লহমায় উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রাচীন সভ্যতার অমলিন ঐতিহ্যে তথা প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত রূপে। কবি বলেছেন তাঁর চুল "কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;" এই শ্রাবস্তী প্রাচীন ভারতের এক বিলুপ্ত নগরী যা ইতিহাসে খোদিত তার উন্নত নগরায়ণ ও স্থাপত্য কুশলতায়। কবি তার নারী চরিত্রকে এহেন উন্নত নগরীর সাথে তুলনা করে বোঝাতে চেয়েছেন বনলতার সৌন্দর্য চির শাশ্বত। পরবর্তীতে কবি ব্যবহার করেছেন এক সামুদ্রিক চিত্রকল্প এবং মানবজাতির প্রতীক কবি হয়ে উঠেছেন 'হাল-ভাঙ্গা নাবিক'। সমুদ্রের বিশালতা ও অন্ধকার যেভাবে নাবিককে দিশেহারা করে তোলে তেমনই আধুনিক যুগের জটিলতা ও যান্ত্রিকতা মানুষকে বিচলিত করে তুলেছে। বিপর্যস্ত নাবিক যেমন 'দারুচিনি দ্বীপ দেখে আশ্বস্ত হন কবিও স্বস্তি ফিরে পান বনলতার 'পাখির নীড়ের' মতো চোখ দুটিতে। এখানে বনলতা কেবলই প্রেমিকা নন হয়ে উঠেছেন এক নিরাপত্তা- নিরাশ্রয়ের চিরন্তন আশ্রয় ও মাতৃত্বের প্রতীকী রূপ।
তৃতীয় স্তবক কবি ও বনলতার সম্পর্কের রসায়নকে করে তোলে আরো নিবিড়। প্রকৃতি ও অতিপ্রাকৃতের মেলবন্ধনে সৃষ্ট চিত্রকল্পে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন এই নিবিড়তাকে। "শিশির শব্দে সন্ধ্যা" ঘনালে পাখিরা দিনশেষে বাসায় ফেরে, নদীর তীরের কোলাহল সব ব্যস্ততার শেষে গন্তব্যে ফিরে আসে আর পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়। কবির দৃষ্টিতে ঘন অন্ধকারে সেই শান্তির খোঁজ তিনি পান বনলতার উপস্থিতিতে। তৃতীয় স্তবকের অন্তে বনলতা সেনকে কোনভাবেই শুধুমাত্র একজন প্রেমিকা রূপে ভাবা যায় না। প্রত্যাবর্তনের চিত্রকল্পে বর্ণিত তিনি আত্মিক শান্তির প্রতীক। বনলতা একাধারে যেমন প্রেম-মধুর্যে পরিপূর্ণ অন্যথায় তিনি কাল জয়ের অন্তরালে মহাকালের পরম আশ্রয় যা জীবনের সমস্ত লেনদেনের শেষে প্রাপ্ত ও উপলব্ধ- মানবাত্মার চিরন্তন নীড়।
—●—
— Advika's
*** The art work used in the blog is original (The imaginary Banolata in the pic is drawn) & a creative interpretation of the character by Advika. It's an independent creative expression not intended as a literal representation of the text.

Your drawing really compliments the analysis...nice article.
ReplyDelete